খাবারের সংকটে বানভাসি মানুষেরা দিশেহারা

শওকত জামান, জামালপুর প্রতিনিধি: বন্যায় ভাসছে সবকিছু। ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট, গাছপালা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মানুষ,গরু-ছাগলসহ
গৃহপালিত পশু। যমুনার পানি কমতে শুরু করলেও পানিবন্দি জেলার প্রায় ৬লাখ মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। ঘরে ঘরে খাবারের অভাব। বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের অভাবে বানভাসীরা হাহাকার করছে।

ত্রানও পাচ্ছে না ঠিকমতো। তীব্র ত্রান সংকট দেখা দিয়েছে বন্যা দুর্গত এলাকাগুলোতে। জামালপুরে দু’দফা বন্যায় ২৪ দিন ধরে পানিবন্দী এসব মানুষজনের খাদ্য,বিশুদ্ধ পানি ও মাথাগুঁজার ঠাই নিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। চরম বেকায়দায় পড়েছে গৃহপালিত গরু ছাগল রাখা ও গো-খাদ্যের সংকট নিয়ে। ত্রাণ সংকটের কথা স্বীকার করছে বন্যা কবলিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরাও। তারা বলছে,বরাদ্ধ কম তাই সবর্ত্র ত্রান দিতে পারছি না।

জেলা প্রশাসন দাবি করছে তাদের ত্রাণ ভান্ডারে পর্যাপ্ত ত্রান মজুদ রয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিতরন হবে। বন্যাদুর্গত এলাকার অসহায় এই মানুষগুলো জীবন বাঁচাতে দ্রুত ত্রানের ব্যবস্থা দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ বেষ্টিত জামালপুর জেলার ৭টি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌরসভার ৬২৫টি গ্রামের বিস্তির্ণ এলাকা বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। প্রায় ৬লাখ পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ২লাখ ১৬ হাজার ৬’শ ৫৫টি পরিবার বন্যায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

বানভাসী ৫০ বছর বয়সী সুফিয়া বেগম। বাড়ি ইসলামপুর সদর উপজেলার শংকরপুর গ্রামে। তার বাড়িতে কোমর পানি। ডুবে গেছে উঠান, টিউবয়েল, রান্নাঘর এমনকি রান্না করার চুলাও। স্বামী আব্দুল করিম (৬৫) রিকসা চালিয়ে পরিবারের ৬ জনের মুখে আহার যোগাতো। বার্ধক্যের ভারে নুব্জ হয়ে পড়ে এখন কর্মক্ষম। ঘরে বসে পড়েছে। চেয়ে চিন্তে মানুষের সহযোগীতায় দিন চলছিল। এখন সকলের একই অবস্থা। সুফিয়া বেগমের পরিবারকে সাহায্য করার অবশিষ্ট কেউ নেই। দ্বিতীয় দফা বন্যায় সপ্তাহ ধরে বন্যার পানিতে ভাসলেও জুটেনি সরকারী ও বেসরকারী সাহায্য সহযোগীতা। একবেলা আধপেট খেয়ে কোনমত বেঁচে আছে পরিবারটি।

শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে সুফিয়া বেগম বলেন, বাবা পানিতে পইরা আছি ৭দিন ধইরা। মেম্বর চেয়ারম্যান কেউ আমগো খোজও নেই নাই। স্লিপ ছাড়া সাহায্য দেয় না। স্লিপের নিষ্টিতে নাম তুলতে নোক নাগে। আমগো নোকও নাই আমরা সাহায্য পাইনা। কথা হয় একই ইউনিয়নের কাঁচিহারা মৃত আব্দুল করিমের ছেলে ৬০ বছর বয়সি মাঝি টল্লু মিয়ার সাথে। কথা বলতে গেলেই ক্ষেপে উঠেন এই বৃদ্ধ। রাগান্নিত কন্ঠে বলেন, আফনাগো সঙ্গে কতা কইয়া নাভ কি? আফনেরা আইছেন,ফটো তুলবেন,নিউজ করবেন সরকার সাহয্য পাঠাবো
হেই সাহয্য চেরাম্যান মেম্বাররা মাইরা খাবু।

সুফিয়া,টুল্লু মিয়া, মাসুদ রানার মতো ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলি,বেলগাছা,সাপধরী ও নেয়ারপাড়া ই্ধসঢ়;উনিয়নের বিভিন্ন বন্যা দুর্গত এলাকা ঘুরে বানভাসী মানুষের সাথে কথা বলে দেখা গেল ত্রাণ না পেয়ে পানিবন্দি মানুষের মানবেতর জীবনচিত্রের করুন দৃশ্য। সাপধরী উনিয়নের কাশারীডোবা গ্রামের বাসিন্দা গণমাধ্যম কর্মী আজিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, সাপধরী ইউনিয়নের সিংহভাগ গ্রামে সরকারী ত্রান পৌঁছেনি। তৎপরতা আমার চোখে পড়েনি,শুনিও নাই।

বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ ইসলামপুরের চিনাডুলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আাব্দুস সালাম ত্রান সংকট বিষয়ে বলেন, মাত্র ৩টন চাল বরাদ্ধ
পেয়েছি। বরাদ্ধের অল্প ত্রান দিয়ে কি হয়? কয়জনকে দিবো? বরাদ্ধ না বাড়লে ত্রান সংকটতো থাকবেই। বন্যা আক্রান্ত সাপধরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: জয়নাল আবেদিনও বলেছে একই কথা। তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নে ২০টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। প্রথম দফা বন্যায় ৬টন ও দ্বিতীয়দফা বন্যায় ২টন পেয়েছি।

এই অল্প ত্রান বন্যা দুর্গত সব এলাকায় দেয়া সম্ভব হয়নি। মাত্র তিনটি গ্রামে ত্রান বিতরন করেছি। ত্রানের কোন সংকট নেই। জেলা প্রশাসনের ত্রান ভান্ডারে পর্যাপ্ত ত্রান মওজুদ রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকল বন্যা দুর্গত এলাকায় ত্রান পৌছে যাবে বলে তীব্র ত্রান সংকটের মুখেও দাবী করেছেন জেলা ত্রাণ ও পুর্ণবাসন কর্মকর্তা মো: নায়েব আলী।

তিনি আরো বলেন, এপর্যন্ত ৩১০ মেট্রিকটন চাল,নগদ ১২ লাখ টাকা ৫০ হাজার টাকা, ৪ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং শিশু খাদ্যের জন্য ২লাখ ও গো-খাদ্যের জন্য ২লাখ টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে।

ত্রানের বরাদ্ধ বৃদ্ধি করে ত্রান বিতরন কার্যক্রম কার্যক্রমের গতি দ্রুত না বাড়লে বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্য সংকটে দেখা দিবে মানবিক বিপর্যয়। বানভাসীদের একটাই দাবি ত্রান দিন, আমাদের জীবন বাঁচান।