দেশে যেন করোনা বলতে কিছু নেই: হাসানুল হক ইনু

ঢাকা অফিস: ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ ও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ ছাড়া করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় প্রস্তাবিত বাজেটে কোনও বরাদ্দ নেই বলে অভিযোগ করেছেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার দরকার ছিল ছকের বাইরে একটা বাজেট। কিন্তু বাজেট দেখে মনে হচ্ছে, দেশে করোনা বলতে কিছু নেই। এটি অস্বাভাবিক সময়ের একটি স্বাভাবিক বাজেট মাত্র।’

হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘করোনার কারণে অনেক দেশ বাজেট তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী এই সংকটের মধ্যেও বাজেট দিয়ে আমাদের গর্বিত করেছেন।’

দেশে এখন অস্বাভাবিক সময় যাচ্ছে উল্লেখ করে জাসদ সভাপতি বলেন, ‘করোনা মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ এবং প্রধানমন্ত্রীর এক লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ছাড়া বাজেটের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ গতানুগতিক, গৎবাঁধা এবং ছকের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

দেশীয় শিল্প সুরক্ষাসহ কর খাতে কিছু ভালো প্রস্তাব থাকলেও বড় ধরনের কোনও সংস্কার প্রস্তাব নেই। দ্বার উন্মোচনকারি উদ্ভাবনী কিছু নেই।

সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘করোনা পুষে রেখে অর্থনীতি সচল হবে না। দুর্নীতি পুষে রেখে করোনা মোকাবিলা, অর্থনীতি সচল করা যাবে না। স্বচ্ছতা, সমন্বয়হীনতা ও অদক্ষতা দূর করে স্তরে স্তরে সুশাসন কায়েম করতে হবে।’

হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘সঠিকভাবে অর্থমন্ত্রী অগ্রাধিকার নির্ণয় করলেও খাত ভিত্তিক বরাদ্দ গতানুগতিক। এমন কোনও বরাদ্দ নেই যেটা স্বাস্থ্য সেবার খোলনলচে বদলে দিয়ে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। নতুন দরিদ্র ও নতুন কর্মহারা কাজ প্রত্যাশী ২৬ লাখ লোককে একটি স্থায়ী দিকে নিয়ে যাওয়ার কোনও নির্দেশনা নেই। রাজস্ব খাত, ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার সংস্কারের দাবির কোনও বক্তব্য নেই।’

ইনু বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ এবং দুটি প্রকল্প মিলিয়ে ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে- এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু মূল বরাদ্দ ৫ দশমিক ১ শতাংশ। গতবার এটা ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থ্যাৎ, মূল বরাদ্দ কমে গেছে। এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য খাতে তিনটি চাহিদা- করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করা, জিডিপির ৫ শতাংশ দিতে হবে এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে করোনা ভাইরাসের ব্যবস্থা এ বছরই নিতে হবে। কয়েকদিন পরে বোঝা যাবে। এ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দে হবে না। আরও বরাদ্দ দেওয়া লাগবে।’

এলাকাভিত্তিক লকডাউনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘দেরিতে হলেও লাল-সবুজ-হলুদ অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে- এটা ভালো। কিন্ত এখানে ব্যবস্থাপনার কাজ তো করা হয়নি। স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে কাজ করবে সেই টিম নেই। কারিগরি নয়, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ একটি জাতীয় কমিটি দরকার। জনস্বাস্থ্য কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দেবে। পুলিশ প্রশাসন এলাকা পাহারা দেবে। এজন্য কমপক্ষে ৫ হাজার কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। আর  তার জন্য এখনই থোক বরাদ্দ দরকার।’

তিনি বলেন, ‘কৃষি সংস্কারের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কৃষি কমিশন গঠন করতে হবে। কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে রফতানি করতে হবে। কৃষি যন্ত্র তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্তদের প্রণোদনা দিতে হবে। সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এজন্য কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তুলে স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে টাকা ধার করতে হবে। মানুষ বাঁচাতে হবে।’

বাজেট বক্তব্যে করোনা ভাইরাস মোকাবিলা, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ ও সামাজিক সুরক্ষা- এই তিনটি খাত বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করেন জাসদ সভাপতি।

গণমাধ্যমের দুরবস্থার প্রসঙ্গ টেনে সাবেক তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গণমাধ্যম এখন ধুঁকছে। করপোরেট কর ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামাতে হবে। নিউজ প্রিন্টের ওপর থেকে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করতে হবে। বিজ্ঞাপন আয়ের উৎসে কর ৪ শতাংশের স্থলে ২ শতাংশ করতে হবে। কাঁচামালের ওপর ৫ শতাংশ আবগারি শুল্ক কমিয়ে শূন্য করতে হবে। টেলিকম সেক্টরে মোবাইলের ওপর ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। ইন্টারনেটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে।’

বক্তৃতার শুরুতে করোনায় আত্মোৎসর্গকারী প্রথম সারির যোদ্ধা চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, সংবাদ গণমাধ্যমের কর্মীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং করোনা আক্রান্ত সকলের সুস্থতা কামনা করেন হাসানুল হক ইনু।

তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও  আওয়ামী লীগ সভানেত্রীসহ আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের  শুভেচ্ছা জানান।