ফরিদপুরে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসের ৫ যাত্রী নিহত


মোঃ রমজান সিকদার
ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি -০৭/০১/২০২৫
ফরিদপুরে আঞ্চলিক সড়কের অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসের ৫ যাত্রী নিহত হয়েছে। এছাড়া মাইক্রোবাস চালক ও স্থানীয় এক চায়ের দোকানদার সহ চারজন আহত হয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলগেটটিতে গেটম্যান না থাকায় ও ট্রেনের হুইসেল না বাজায় এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া রেলক্রসিংয়ের দুইপাশে অবৈধ দোকান গড়ে উঠায় মাঝেমধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।
নিহতরা সকলেই পরস্পর নিকটাত্মীয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ সদরের ভুইয়াপাড়া এলাকার মামুন চৌধুরী লিটন (৫০) ও তার স্ত্রী ফাহমিদা শারমিন মুন (৪২), শ্যালক শহিদ ভুইয়ার স্ত্রী আতিফা রহমান (৩৬), নিকটাত্মীয় বন্দর থানার দড়িমোল্যাকান্দা এলাকার উম্মে তাসরুমা রিনতু ও চাচাতো ভাই হাসিব জহিরের স্ত্রী সাজিয়া সাজু (৪৫)। এছাড়া লিটন চৌধুরীর মেয়ে তাসরিফ আক্তার (১৮), শ্যালিকা অরিন (৩৫), মাইক্রোবাস চালক নাজমুল হোসেন (৩৫) ও স্থানীয় চা দোকানি মো. জিন্নাহ আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা উদ্ধার করে তাঁদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২ টা ১৫ মিনিটে রাজবাড়ী-ভাঙ্গা রেলপথের ফরিদপুর সদরের গেরদা ইউনিয়নের মুন্সিবাজার-গজারিয়া আঞ্চলিক সড়কের কাফুরা রেলগেট এলাকায় ঢাকাগামী মধুমতি এক্সপ্রেসের সাথে মাইক্রোবাসটি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে মাইক্রোবাসের ৩ জন যাত্রী মারা যায় এবং হাসপাতালে নেয়ার পথে আরও দুজন মারা যায়। এর আগে দুপুর ১২ টা ৫ মিনিটে ট্রেনটি ফরিদপুর স্টেশন থেকে ঢাকা উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে বলে স্টেশন মাষ্টার নিশ্চিত করেন। এছাড়া মাইক্রোবাসটি মুন্সিবাজার থেকে গজারিয়ার দিকে যাচ্ছিল।
ঘটনার সময় রেলক্রসিং সংলগ্ন এক চায়ের দোকানে বসা ছিলেন স্থানীয় হারুণ অর রশিদ। তিনি বলেন, আমরা পাশে বসেই চা খাচ্ছিলাম। ট্রেনের হর্ণের শব্দ শুনি নাই। হঠাৎ শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি একটি মাইক্রো টেনে নিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। তখন মাইক্রোর সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে আগুনও ধরে যায়। কিছুদূরেই মাইক্রোটি পাশের পুকুরের ভেতর পড়ে যায়। তখন আমরা দৌড়ে গিয়ে ৫ জনকে গাড়ি থেকে বের করে হাসপাতালে পাঠায় এবং ৩ জনকে মৃত অবস্থায় বের করি।
ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার নুরুজ্জামান জানান, দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে আমরা খবর পাই। তাৎক্ষণিক এসে উদ্ধার তৎপরতা চালায়। মাইক্রোবাসটি ট্রেন ক্রসিং থেকে ট্রেনের ধাক্কায় কমপক্ষে ১০০ ফিট দূরে রেল লাইনের পাশে একটি পুকুরের মধ্যে গিয়ে পড়ে। পুকুর থেকে মাইক্রোবাসটি উদ্ধার করা হয়েছে। গাড়ির ভিতর বা পুকুরে কাউকে পাওয়া যায়নি।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আহত অবস্থায় রয়েছেন মামুন চৌধুরী লিটনের মেয়ে তাসরি আক্তার। সে জানে না তার বাবা-মা মারা গেছে। তাসরি জানান, নারায়ণগঞ্জের থেকে সকালে তারা এক আত্মীয়ের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চন্দ্রপাড়ায় যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, মাইক্রোবাসটি নিহত মামুন চৌধুরী লিটনের ব্যক্তিগত। গত দুই বছর যাবৎ গাড়িটি চালাচ্ছিলেন খুলনা জেলার নাজমুল হোসেন। তিনিও নিশ্চিত করেন নিহতদের এক আত্মীয়ের জন্য মেয়ে দেখার জন্য যাচ্ছিলেন।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান মোল্লা ও পুলিশ সুপার আব্দুল জলিল। এ সময় জেলা প্রশাসক বলেন, দুঃখের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ এই ক্রসিং এ কোন গেটম্যান না থাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এখানে স্থায়ীভাবে রেলগেট করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এছাড়া নিহতদের বহন ও দাফনের জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।
এদিকে দুর্ঘটনার ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। এক পর্যায়ে তারা পরবর্তী ট্রেনটি গতিরোধ করে। তারা দাবি করেন, এখানে রেলগেট নির্মাণ ও না করা পর্যন্ত ট্রেন চলবে না। তারা বলেন, প্রায় এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে তবুও রেলগেট করা হয়নি।
এ বিষয়ে ফরিদপুর স্টেশন মাষ্টার তাকদির হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ওই এলাকাটি মূলত অরক্ষিত ছিল। সেখানে কোনো অনুমোদিত রেলগেট কিংবা গেটম্যান নেই। এছাড়া রেলক্রসিংটি গুরুত্বপূর্ণ না থাকায় রেলগেট নির্মানের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কখনো অবগত করা হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া তিনি বলেন, রেলওয়ের কয়েকটি বিভাগ থাকায় এবং আমরা নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা হওয়ায় আমাদের কথা অনেক সময় গুরুত্ব দেয়না। বিষয়টি এখন জানানো হবে।