সদরপুর উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন পদ্মার চরে চালু হলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়


মোঃ রমজান সিকদার,
ভাঙ্গা ফরিদপুর সংবাদদাতা -২৮/০৪/২০২৫

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা নদীর দুর্গম চর নারিকেলবাড়িয়ায় চালু হলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। এতে করে প্রমত্তা পদ্মা বুকে জেগে উঠা চরের পিছিয়ে পড়া এই জনপদের শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়ন, যা নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপের মতো। চারদিকে প্রমত্তা পদ্মা নদীবেষ্টিত এই চরের প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। এতদিন এই চরের বাসান্দাদের ছেলেমেয়েরা মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। যেখানে ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় এখানকার শিশুরা পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত না। তাদের হাতে বই-খাতা-কলমের পরিবর্তে দেখা যেত মাছ ধরার সরঞ্জাম কিংবা গরু-ছাগলের রশি।
তবে এবার সেই চিত্র বদলাতে চলেছে। হাওলাদারকান্দি গ্রামে সদরপুর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এবং একটি নতুন আশার আলো।
২০২৩ সালে সদরপুরের তৎকালীন ইউএনও আহসান মাহমুদ রাসেল এই অঞ্চলে পরিদর্শনে এসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ চিত্র দেখে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আবুল হাওলাদার বিদ্যালয়ের জন্য এক একর জমি দান করেন। এরপর উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার।
যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুর্গমতা এখানকার মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই চরে যেতে হয় ট্রলারে করে, যা সদরপুরের ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী নৌঘাট থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। এমন প্রতিকূলতার মাঝে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন সত্যিই এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজামল্লিক জানান, আগে ইচ্ছা থাকলেও ছেলেমেয়েদের পঞ্চম শ্রেণির পর আর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হতো না। এই মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হওয়ায় তাদের সন্তানরা এখন আরও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সরদার এই উদ্যোগকে চরবাসীর জন্য উপজেলা প্রশাসনের একটি উপহার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর ফলে চরের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ঘটবে। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের জন্য টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে এবং বেঞ্চসহ শিক্ষা উপকরণও পৌঁছে গেছে। শীঘ্রই শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এই চরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ছিল প্রায় অকল্পনীয়। প্রশাসন ও স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ এই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।
বিদ্যালয়ের জমিদাতা আবুল হাওলাদার মনে করেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় এখানকার শিশুরা দূরবর্তী এলাকায় যেতে চাইত না, ফলে শিক্ষার হার ছিল খুবই কম। নতুন বিদ্যালয়টি তাদের শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকিয়া সুলতানা জানান, পূর্বের ইউএনও আহসান মাহমুদ রাসেল এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন এবং তিনিও এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। চরবাসী তাদের স্বপ্নের বিদ্যানিকেতন পেয়েছে। সরকারি বরাদ্দের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কেনা হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও পাঠদানের অনুমতির অপেক্ষা। এই বিদ্যালয়টি সত্যিই এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার বাতিঘর হয়ে উঠবে, এমনটাই আশা স্থানীয়দের।