ষ্টাফ রিপোর্টার: একাত্তরের রণাঙ্গনের বীরমুক্তিযোদ্ধা কুদ্দুসুর রহমান মৃত্যুর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করতে চান। জীবন যুদ্ধে পরাজিত এই বীর সৈনিক গণমাধ্যমকে তার এই শেষ ইচ্ছের কথা জানান।
গণমাধ্যমের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে ফরিদপুরের সদর উপজেলার আদমপুর গ্রামে বীরমুক্তিযোদ্ধা ও ফরিদপুর জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি মরহুম এসএম নুরুন্নবী’র সাথে একত্রে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে তিনি ভাঙ্গা পৌর সদরের ডাকবাংলো’তে বঙ্গবন্ধুর সাথে একত্রে রাত্রীযাপন করেন। এরপর ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে এবং নগরকান্দা উপজেলার তালমা এলাকায় বঙ্গবন্ধুর সাথে একাধিক গণসংযোগ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ্য পুত্র শেখ কামালের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকার ৩২ ধানমন্ডির বাসায় গিয়েছিলেন। বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. কুদ্দুসুর রহমানের সাথে বঙ্গবন্ধুর একাধিক স্মৃতিবিজড়িত ঘটনাবলী রয়েছে। যা এখন শুধুই অতীত।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এই বীর সৈনিকের আদি পৈত্রিক ভিটা ছিল ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নন্দলাপুর গ্রামে। পৈত্রিক ভিটামাটি একসময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরে নিরুপায় হয়ে বাবার হাত ধরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ফুলসুতি ইউনিয়নের ফুলসুতি গ্রামে মামা বাড়ীতে চলে আসেন। এখান থেকেই স্বপ্রনোদিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ভাঙ্গার বীরমুক্তিযোদ্ধা মরহুম বড় আবু মিয়া, ফরিদপুরের এসএম নুরুন্নবী, ফুলসুতির গোলাম রসুল চৌধুরী, শহিদুল আলম চৌধুরী, তালমা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু শহীদ মিয়া, টাঙ্গাইলের আবুল কালাম আজাদ, বোয়ালমারীর সাবেক এমপি শাহ্ আবু জাফরসহ অসংখ্য বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত এই বীরমুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে একজন ভাস্কর্য শিল্পী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি একাধারে কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার চৌরাস্তায় মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, রাঙামাটি জেলা সদরে বঙ্গবন্ধুর, ঢাকার জিঞ্জিরার কালীগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা, ফরিদপুরের রাজবাড়ি রাস্তার মোড়ে মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু, রাজবাড়ী জেলা সদরে বঙ্গবন্ধুর, নগরকান্দা উপজেলার জয়বাংলা মোড়ে মুক্তিযোদ্ধা ও খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এর ভাস্কর্য তৈরী করে খ্যাতি অর্জন করেন। বিভিন্ন ভাস্কর্য নির্মান তার একমাত্র জীবন জীবিকার নেশা ও পেশা। বর্তমানে ভাস্কর্য নির্মানের ক্ষেত্র অপ্রতুল হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
তার পুত্র মো. নীরব ইসলাম ফরিদপুর রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্র এবং কন্যা নাদিয়া ইসলাম পূর্ণতা ফরিদপুর সিটি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যায়নরত। স্ত্রী পান্না বেগম একজন গৃহিনী। ৪ সদস্যের এই পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমসিম খাচ্ছেন বীর এই মুক্তিযোদ্ধা।
অতি আক্ষেপের সাথে বীরমুক্তিযোদ্ধা কুদ্দুসুর রহমান গণমাধ্যমকে আরও জানান, জীবন বাজী রেখে দেশকে বহি:শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। অথচ স্বাধীনতার এতটা বছর পেরিয়ে গেলেও স্বাধীনতার সুফল এখনও ভোগ করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অনেকেই বিভিন্ন কায়দায় মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। কিন্তু আমরা সম্মূখ যুদ্ধে অংশগ্রহন করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে ব্যবহারকৃত রাইফেল জমা দিয়েও আজও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নিজের নাম লিপিবদ্ধ করাতে পারিনি। একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখনও সরকারী কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছিনা। মরহুম বীরমুক্তিযোদ্ধা জেনারেল ওসমান গনি স্বাক্ষরিত মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও অস্ত্র জমা দেবার সনদ থাকলেও রাষ্ট্রীয় হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা হতে পারিনি। এটা আমার কষ্ট।
স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি বীর এই মুক্তিযোদ্ধা কুদ্দুসুর রহমান আকুতি জানিয়ে তার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভাঙ্গার আলো প্রতিনিধিকে (০১৭৭৭-৩৫৮১০৩) বলেন, আমার জীবনের কোন চাওয়া পাওয়া নেই। তবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আজও বেঁচে আছি। জীবনের শেষ মূহুর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা’র সাথে দেখা করে মনের শেষ দুটি কথা বলতে চান তিনি।

