
মোঃ রমজান সিকদার,
ভাঙ্গা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা -২৬/১২/২০২৪
ঢাকা-ভাঙ্গা হাইওয়ে এক্সপ্রেস ও ফরিদপুর-বরিশাল ও ভাঙ্গা- খুলনা মহাসড়কের দুর্ঘটনা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এসব সড়কে প্রতিদিন ছোট বড় মিলে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক যানবাহন চলাচল করে থাকে। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লড়ি, ড্রাম ট্রাক , প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মটর সাইকেল সহ অবৈধ থ্রী হুইলার, ইজিবাইক, ব্যাটারি চালিত রিকশা ও মটরবাইক চলাচলে চালকেরা মানছে না কোন নিয়মনীতি। পুলিশের কিছুটা নিস্ক্রিয়তায় সড়কের শৃঙ্খলা না থাকার সুযোগে বেপরোয়া গতির যানবাহনে ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে দুর্ঘটনা কবলিতদের। সড়কগুলোতে হাজার হাজার অবৈধ থ্রী হুইলার, রেজিস্ট্রেশন বিহীন শতশত মটরসাইকেল, ফিটনেস বিহীন যানবাহন বেপরোয়া গতির চলাচলের কারণে বৈধ যানবাহন গুলো পড়েছে বিপাকে।
পুলিশের হিসাবে গত ১ বছরে ভাঙ্গা ও শিবচর হাইওয়ে থানার অন্তর্ভুক্ত সড়কে মোট দুর্ঘটনা ঘটে ৯৯ টি। এতে প্রান হারায় ১১৫ জন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেন ১১১ জন। এছাড়াও লোকাল থানার অন্তর্গত বিভিন্ন ফিডার সড়কের ইজিবাইক- মটরসাইকেল, ইজিবাইক – ইজিবাইক ও ইজিবাইক – নসিমন- করিমনের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুর্ঘটনা ঘটনা নিয়মিত। এতে স্কুল – কলেজের শিক্ষার্থী, কিশোর ও ভাঙ্গার সাংবাদিক মিরান মাতুব্বর সহ শিশু নিহত ও গুরুতর আহত হওয়ার একাধিক ঘটনা রয়েছে।
গত কয়েকদিনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একের পর এক সড়কে ঝড়েছে প্রাণ। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৮ জনের এবং আহত হয়েছে আরও ৫ জন। তাঁদের মধ্যে ৬ জনই কিশোর ও তরুণ রয়েছে। এসব দুর্ঘটনার পেছনে বেরিয়ে এসেছে ৪টি কারণ। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে উঠতি বয়সি তরুণদের বেপরোয়া ড্রাইভিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, হেলমেট ব্যবহার না করা এবং বাস, মাইক্রোবাস , প্রাইভেট কার ও ট্রাকের বেপরোয়া গতি। এরমধ্যে তিনটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রতিটি মোটরসাইকেলে তিনজন করে যাত্রী ছিলেন। এসব দুর্ঘটনার পরও মহাসড়কে হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালকেরা একাধিক যাত্রী নিয়ে বেপরোয়া গতিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের অনেকেরই নেই লাইসেন্স ও গাড়ির বৈধ কাগজপত্র ।
জানা যায়, গত ৭ ডিসেম্বর বিকেলে ভাঙ্গা উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের সলিলদিয়া এলাকায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ডাম্প ট্রাকের বেপরোয়া গতিতে প্রাণ হারায় মোটরসাইকেলে থাকা ইমন খালাসী (২২) ও রমজান ওরফে তৌকির (২০) নামে দুই বন্ধু।
এর দুদিন পরেই ৯ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের নাগারদিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বেপরোয়া ট্রাকের ধাক্কায় মারা যায় আরও দুই বন্ধু। তাঁরা নগরকান্দা উপজেলার চরযশোরদি ইউনিয়নের আশফোরদি গ্রামের হাবিব সরদারের ছেলে তাজিম সরদার (২২) ও ভাঙ্গা উপজেলার পশ্চিম আলগী গ্রামের সেন্টু মাতুব্বরের ছেলে শাওন মাতুব্বর (২৫)। ১৬ই ডিসেম্বর বিকালে ফরিদপুর-ভাঙ্গা মহাসড়কের ভাঙ্গা পৌরসভার নওয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অজ্ঞাত বেপরোয়া গতির বাস চাপায় মারা যায় দুই ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে রয়েছে, জেলা সদরের পশ্চিম আলীপুর এলাকার খন্দকার বজলুর রহমানের ছেলে খন্দকার মামুনুর রহমান (৪২) এবং অপরজন চরভদ্রাসন উপজেলার খালাসীডাঙ্গা গ্রামের পরোশ কাপাসিয়ার ছেলে দীপক কাপাসিয়া গোপি (৪৫)।
এছাড়াও বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর সময় হাইওয়ে এক্সপ্রেসের ভাঙ্গা আতাদী ফ্লাইওভারের উপরে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শাওন(২০) নামের এক কিশোর নিহত হয়। অন্যদিকে ভাঙ্গা উপজেলার সীমান্তবর্তী নগরকান্দা উপজেলায় মারা যায় দুই কিশোর। তাঁরা হলো- নগরকান্দা উপজেলার মধ্যবালিয়া গ্রামের বেলায়েত মাতুব্বরের ছেলে খালিদ মাতুব্বর (১৪) ও চরভদ্রাসন উপজেলার সদর ইউনিয়নের বিএসডাঙ্গী গ্রামের মোশারফ হোসেন মণ্ডলের ছেলে হাসিবুল হাসান ওরফে আশরাফুল (২০)।
১৬ই ডিসেম্বর জয়বাংলা-নগরকান্দা আঞ্চলিক সড়কে মোটরসাইকেলের সাথে একটি ব্যাটারীচালিত অটোরিক্সার মুখোমুখি সংঘর্ষে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে মটরসাইকেল চালক কিশোর খালিদ মাতুব্বর ঘটনাস্থলে মারা যায়।
অপরদিকে রাজধানী ঢাকাগামী দূরপাল্লার পরিবহন ,মালবাহী ট্রাক, লড়ি, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস সহ সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ঘন কুয়াশায় পার্শ্ববর্তী আইল্যান্ডে উঠে যাওয়া, টোল প্লাজায় ধাক্কা দেওয়ার মতো দুর্ঘটনায় অসংখ্য যাত্রীর প্রাণহানি ঘটেছে।
এসব দুর্ঘটনা রোধে সড়ক ও মহাসড়কে কিশোর ও উঠতি বয়সি তরুণদের বেপরোয়া ড্রাইভিং রোধে ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন, পুলিশের কঠোর নজরদারি ও হস্তক্ষেপে কমে আসতে পারে এসব দুর্ঘটনা।
ঢাকা- ভাঙ্গা হাইওয়ে এক্সপ্রেসে সিসি ক্যামেরা থাকলেও তার কার্যকারিতা না থাকায় নির্ধারিত গতির চাইতেও বেশি গতিতে যানবাহন চলাচল করে আসছে। পুলিশ মাঝেমধ্যে স্পিড গান দিয়ে কিছু যানবাহনকে মামলা দিলেও তা খুবই সামান্য।
ফরিদপুর -বরিশাল মহাসড়কটি সংকীর্ণ এবং বিভিন্ন বাঁক থাকায় প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া এ সড়কে পথচারী চলার মত কোন ফুটপাত না থাকায় প্রতিনিয়ত পথচারীরা রাস্তা চলাচলে আতঙ্কে থাকেন।
এ ব্যাপারে ফরিদপুর -টেকেরহাট রুটের একটি লোকাল বাসের চালক শাহিন শিকদার(৩৫) বলেন, ভাঙ্গা থেকে মাদারীপুরের টেকেরহাট পর্যন্ত রাস্তার নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। রাস্তাটি এমনিতেই সংকীর্ণ। সেই রাস্তার একপাশের তিন ফুট জায়গা গর্ত করে নির্মাণ কাজ চলছে। এতে রাস্তার প্রশস্ততা কমে গেছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে দুর্ঘটনা। রাস্তা নির্মাণের কাজ অতি দ্রুত শেষ করা দরকার। ভাঙ্গা বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষমান একটি পরিবহনের বাস যাত্রী বরিশালের বাসিন্দা মোহাম্মদ হেমায়েত হোসেন জানান, ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে প্রশস্ত। উক্ত এক্সপ্রেসওয়েতে বাসের ড্রাইভারেরা দ্রুত গতিতে গাড়ি চালায়। অন্যদিকে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত সড়কটি সংকীর্ণ। এ সড়কে গাড়ির অত্যাধিক চাপ থাকে । এছাড়া এ সড়কে ধীর গতির ভ্যান ,অটো রিক্সা চলাচল করে। অনেক সময় চালকেরা ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়।
অপরদিকে ভাঙ্গা- খুলনা মহাসড়কটিতে বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। ঢাকা থেকে বাগেরহাটগামী একটি পরিবহনের যাত্রী শাহ আলম তালুকদার জানান, ভাঙ্গা থেকে বাগেরহাটের নোয়াপাড়া পর্যন্ত রাস্তাটি আরো প্রশস্ত করা দরকার।দ্রুতগতি এবং ওভার টেকিং প্রবণতা মূলত সড়ক দুর্ঘটনার কারণ। এছাড়া অনেক সময় চালকেরা মোবাইল ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত থাকে। বাসগুলোর গতি নির্ধারণের জন্য পুলিশকে আরো শক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়া বাসগুলোর ফিটনেস পরীক্ষা করা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি আরো প্রশস্ত করা দরকার।
সচেতন নাগরিক ও ভাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বিশ্বাস বলেন, যতদিন সড়কে ট্রাফিক আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হবে ততদিন সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে না। পরিকল্পিত সড়ক নির্মাণেও কর্তৃপক্ষকে দৃষ্টি দিতে হবে। ভাঙ্গা খুলনা মহাসড়কটিতে বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। হাইওয়েতে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র দিয়ে চালকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। মহাসড়ক থেকে অবৈধ যান চলাচলে পুলিশকে আরো ভূমিকা পালন করতে হবে।
ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমান উপজেলা আইন শৃঙ্খলা সভায় পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কিশোর ও লাইসেন্সবিহীন মোটরবাইক চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার রোধে সড়কে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে চালকদের আরো বেশি সচেতনা মূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে।
এ বিষয়ে ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার উপ পরিদর্শক মোঃ আব্দুল্লাহেল বাকি জানান, আমরা নিয়মিত সড়কে টহল দিচ্ছি। জনবল কম থাকায় দক্ষিণ অঞ্চলের প্রবেশদ্বার ভাঙ্গার চতুর্দিকে কভারেজ দেওয়া আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। সড়কে ট্রাফিক আইন মেনে যানবাহন চালাতে ও বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।
শিবচর হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম জানান, হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়ের প্রতিটি লেনে ডাবল যানবাহন চলাচলের সুবিধা রয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চালকেরা নির্ধারিত গতির চাইতেও ডবল গতিতে চলাচল করে থাকে। আমরা নিয়মিত স্পিড গান দিয়ে মামলা দিচ্ছি। তারপরেও প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কের সিসি ক্যামেরার কার্যক্রম শুরু হলে হয়তো কিছুটা দুর্ঘটনা কমে আসবে। তাছাড়া চালকদের মন মানসিকতা তৈরি করতে হবে ট্রাফিক আইন মেনে যানবাহন চলাচলের।
- Home
- জেলা সংবাদ
- ভাঙ্গা
- ফরিদপুরে হাইওয়ে এক্সপ্রেস ও মহাসড়কের দুর্ঘটনা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার

