
মোঃ রমজান সিকদার
ভাঙ্গা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা-০৭/০৫/২০২৬
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ব্রাক্ষণকান্দা আব্দুল শরীফ একাডেমীতে এসএসসি পরীক্ষা-২০২৬ পরীক্ষায় অযোগ্য ২১ শিক্ষার্থীকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ফরম পূরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরফলে পরীক্ষার প্রথম দিন থেকেই প্রশ্নপত্র কম পড়ছে। পরবর্তীতে শিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিশেষ ব্যবস্থায় প্রশ্ন পাঠিয়ে পরীক্ষা সচল রাখছে। বিষয়টি জানাজানি হলে নড়েচড়ে বসেছে কতৃপক্ষ। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক এনামুল কবির ও সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম কবির এবং অভিভাবক সদস্য সাজিব তালুকদার সজলের শাস্তি দাবি করেছেন শিক্ষ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
এর আগে বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দূর্ণীতির অভিযোগ পাওয়া ওঠে। চলতি বছরের(২০২৬) এসএসসি পরীক্ষার শুরুর তিনদিন আগে ওই বিদ্যালয়ে বহিরাগত এক শিক্ষার্থীসহ আরও অযোগ্য ২০ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সম্প্রতি সময়ে। বর্তমান ঐ ২১ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ায় প্রতিদিন পরীক্ষার্থীদের ২১ টি প্রশ্ন পত্র কম পড়ছে। প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্ন পত্র যোগাড় করতে হল সুপার সহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হিম সিম খেতে হয়। পরে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রশ্নপত্র ট্রেজারির মাধ্যমে প্রশ্ন পত্র পুনরায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।
বিষয়টি বুধবার (০৬ মে) জানাজানি হলে ভাঙ্গা উপজেলায় আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এবিষয় একজন অভিভাবক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ দিয়ে জানা যায়, ভাঙ্গার পুখুরিয়ার ব্রাক্ষণকান্দা আব্দুল শরীফ একাডেমীতে নিয়মিত পরীক্ষার্থী রয়েছে ৩৯ জন। এরপর বিশেষ তদবিরে ২/৪ বিষয় ফেল করা ছাত্র ছাত্রীদের ফরম পূরণ করে পরিক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেন আরো ২৮ জন পরিক্ষার্থী। পরবর্তীতে পরিক্ষার তিনদিন আগে ২১ অযোগ্য পরীক্ষার্থীর নিকট থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেন প্রধান শিক্ষক সহ কয়েকজন শিক্ষক ও একজন অভিভাবক সদস্য।
এ ঘটনায় ভাঙ্গার সুশীল সমাজের মাঝে আলোচনা ও সমালোচনা ঝড় উঠেছে।
পরিক্ষার শুরুর দিকে প্রতিদিন এস,এস,সি পরীক্ষার সময় ২১টি প্রশ্নপত্র কম পড়ে। প্রশ্ন পত্র যোগাড় করতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
এ ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছেন প্রধান শিক্ষক এনামুল কবির, সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম কবির, কয়েকজন সহকারী শিক্ষক ও কম্পিউটার শিক্ষক মোঃ শাহআলম সহ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সাজিব তালুকদার সজল।
এছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দূর্ণীতির অভিযোগে অভিভাবক গন প্রধান শিক্ষক এনামুল কবিরকে স্কুলে ভেতরে আটকে রেখে মারধর করে। পরবর্তীতে ভাঙ্গা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে।
থানার উপপরিদর্শক রাম প্রসাদ জানান, প্রধান শিক্ষক এনামুল কবিরকে এলাকাবাসি মারধর করে স্কুলের ভেতরে আটকে রাখে। খবর পেয়ে আমরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি।
তবে এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক এনামুল কবির বলেন, আমাকে মারধর করার পর আমি কিছু দিন অসুস্থতার কারণে বিদ্যালয় ঠিকমত আসতে পারি না। আমি চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থী ৬৭ জন পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করেছি কিন্তু বাকি ২১ জন পরিক্ষার্থী কিভাবে ফরম পূরণ করেছেন আমি জানি না । আমার পাসওয়ার্ড চুরি করে এই ২১ জনের ফরম পূরণ করেছেন আমার কয়েকজন শিক্ষক।
এই অযোগ্য ২১ শিক্ষার্থীকে না নিলে আমাকে হাত-পা ভাঙ্গারও হুমকি দেয় তারা। পুনরায় আমাকে মারধর করার পায়তারা করছেন ও হুমকি দিচ্ছে। এই ভয়ে আমি বিদ্যালয় মাঝে মাঝে অনুপস্থিত থাকি। এই নিয়ে আমার শিক্ষকদের সাথে ঝগড়াঝাঁটি হচ্ছে। তবে আমি এদের ফরম পূরণ করি নাই। এ সমস্ত কিছুর সাথে আমার সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম কবির ও অভিভাবক সদস্য সম্পুর্ন দায়ী। তারা অপরাজনীতি করে আমাকে ইতিপূর্বে মার খাইয়েছে এখন আমাকে চাকুরিচ্যুত করার পাঁয়তারা করছে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে সত্য উদঘাটন করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক গোলাম কবির বলেন, ২১ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণে প্রধান শিক্ষক দায় এড়াতে পারেন না। আমরা প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে ২১ জন শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করেছি। এই ফরম পূরণের টাকা বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা দিয়েছি। তিনি( প্রধান শিক্ষক) স্কুলে না আসায় আমার কয়েকজন শিক্ষক ও কম্পিউটার শিক্ষক ও অভিভাবক সদস্য সজলদের সাথে নিয়ে এই ফরম পূরণের কাজগুলো করেছি। আমি শুনেছি এই ফরম পূরণের জন্য পরিক্ষার্থী নিকট থেকে ৮ হাজার টাকা থেকে ১২০০০ টাকা করে নিয়েছে।
এরমধ্যে ফরম ও পূরণ কোচিং ফির টাকা বাদ দিয়ে বাকি টাকা আমরা কয়েকজন শিক্ষক সহ কয়েকজন ভাগ করে নিয়েছি।
এ বিষয় বিদ্যালয়ের অভিভাবক সাজিদ মাহমুদ সজিব তালুকদার জানান, আমার কাছে অনেকে অবিভাবক তার সন্তানের জন্য অনুরোধ করেছে। এলাকার পরিবেশ শান্ত রাখার জন্য কয়েকজন ছাত্র ছাত্রীর ফরম পূরণে আমি প্রধান শিক্ষক ও সরকারি প্রধান শিক্ষককে সুপারিশ করছি। এর মধ্যে এক নেতার বিশেষ সুপারিশে বহিরাগত এক পরিক্ষার্থীকে নিয়েছি। এসব শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আমি এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না। তবে এ সমস্ত অযোগ্য পরীক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করায় বিদ্যালয়ের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে এবং এর জন্য পাশের হার কমে আসবে। শিক্ষকেরা যদি অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। তাহলে এ সমস্ত শিক্ষক দ্বারা ভালো কিছু আশা করা যায় না। স্থানীয় দলীয় প্রভাব বিস্তারের কারণে বর্তমানে লেখাপড়ার মান নিচে নেমে গেছে। পাশের হার কমে গেছে।
ভাঙ্গা উপজেলার আব্দুল শরীফ একাডেমির পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেন ভাঙ্গা কাজী শামচুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে । সেখানকার কেন্দ্র সচিব ও বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক অরুন দত্ত বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের নিকট বিষয়টি অবগত করা হলে তিনি অনলাইনে চেক করে কম পড়ার বিষয়টি দেখতে পান। পরে ট্রেজারীর মাধ্যমে ওই প্রশ্নপত্র গুলো পুলিশ পাহারায় নিয়মতান্ত্রিক ভাবে ফরিদপুর থেকে ভাঙ্গায় আনা হয়। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।
এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের সভাপতি ও নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন, আমি আজকে জয়েন্ট করবো। তবে ২১ পরিক্ষার্থীর ফরম পূরণ ও প্রশ্ন পত্র কম পড়ার বিষয় আমি অবগত নই। আপনাদের নিকট থেকে বিস্তারিত জানতে পারলাম । তবে ব্রাহ্মণকান্দা আব্দুল শরীফ একাডেমিতে কেউ অনিয়ম করে থাকলে তদন্তপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

