সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত হারানো (মৃত) রাজীব হোসেনকে দায়ী করে কোনো বক্তব্য দেননি বলে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে প্রতিবাদ করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আজ সন্ধ্যায় ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ওবায়দুল কাদের নিজেই আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন এবং প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ করেন।
আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর হাতিরঝিলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিদর্শনে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলেন ওবায়দুল কাদের। এ বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ চারদিকে সমালোচনা শুরু হয়। এ বক্তব্যের মাধ্যমে মন্ত্রী মৃত রাজীবকেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন—চারদিকে এমন অভিযোগ ওঠে। পরে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা আবু নাসের প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রীর বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রাজধানীর মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন (২১)। তাঁর হাতটি বাসের সামান্য বাইরে ছিল। হঠাৎ করে পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে পেরিয়ে যাওয়ার বা ওভারটেক করার জন্য বাঁ দিকে গা ঘেঁষে পড়ে। দুই বাসের প্রবল চাপে রাজীবের ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গত সোমবার দিবাগত রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজীব হোসেন মারা যান।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গোপালগঞ্জ সদরের বেতগ্রাম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় ডান হাত হারান একটি বাসের চালকের সহকারী খালিদ হোসেন হৃদয়। টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের একটি বাসে করে গোপালগঞ্জ যাচ্ছিলেন খালিদ হোসেন। তিনি বাসের পেছনের আসনে বসে ডান হাত দিয়ে জানালার মাঝখানের রড ধরে ছিলেন। এ সময় পেছন দিক থেকে আসা একটি ট্রাক বাসটিকে ওভারটেক করতে গিয়ে হঠাৎ করে ট্রাকটি বাসের পেছন অংশ ঘেঁষে চলে যায়। এতে হৃদয়ের ডান হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আজ সকালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিদর্শনে গিয়ে ওবায়দুল কাদের নিজে থেকেই দুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। মন্ত্রী তাঁর কথায় রাজীব বা খালিদ হোসেন কারও নামই উল্লেখ করেননি। তাঁর বক্তব্যের একটি জায়গায় একজন হেলপার দুর্ঘটনায় হাত হারিয়েছে, এমন কথা বলে একটি পত্রিকাকে উদ্ধৃত করেন। এ সময় তিনি ওই ছেলেটির (নাম না বলে) দাঁড়ানোর কথা বলেন। হাত হারানো (মৃত) রাজীব হোসেন বাসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ কারণে স্বভাবতই রাজীবের বিষয়টি সংবাদে এসেছে। গোপালগঞ্জেরর দুর্ঘটনায় হাত হারানো খালিদ হোসেন হৃদয় বাসের পেছনের আসনে বসে ছিলেন।
সকালে সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে হাতিরঝিলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সড়কের খারাপ-ভালো তো এর সঙ্গে জড়িত না। যারা চালাচ্ছে এবং গাড়িতে যারা আরোহী, তারা এর সঙ্গে দায়ী। হতে পারে ওই ছেলেটাও ভুল করতে পারে। তার দাঁড়ানোটা সঠিক নাও হতে পারে।’ সেতুমন্ত্রী কাদের আরও বলেন, ‘ছেলেটার হাত চলে গেছে, একটা ইমপরটেন্ট কাগজে আমি দেখলাম, সড়ক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে। এর সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনার কী সম্পর্ক?’ এ সময় সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন, আপনি কাকে দায়ী করবেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে চালকদের সচেতনতা খুব জরুরি। এখানে সড়কের কোনো সম্পর্ক নেই। গাড়ি ওভারটেক করতে গিয়ে একজনের হাত গেল, এর সঙ্গে সড়কের কী সম্পর্ক?’
আজ সন্ধ্যায় আগের দেওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমি যা বলিনি, সেটা যদি আমার নামে চালানো হয়, তাহলে এ বিষয়টা আমার জন্য মেনে নেওয়া খুব কঠিন। আমি রাজনীতি করি, কেউ বলতে পারবে না…কারও কথাবার্তা বলতে ভুল হয়। ভুল আমারও হয়, তবে এ ধরনের ভুল আমি করি না। ভুল করলে সংশোধন করার মানসিকতা আমার আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, আমি রাজীবের নাম নিয়ে, তাঁর ভুল হয়েছে —এ রকম কথা আমি বলিনি। আপনারা যাঁরা ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং অনলাইনেরও অনেকেই ছিলেন, তাঁরাও বিষয়টি লক্ষ করেছেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়া কি আমাকে ছেড়ে দিত? যদি আমি এ ধরনের কথা বলতাম? সেখানে এক ধরনের কথা দিয়ে আমি শুরু করেছি। সেটা হচ্ছে গোপালগঞ্জের যে বাসের হেলপার (খালিদ হোসেন হৃদয়), তাঁকে দিয়ে আমি শুরু করেছি। রাজীবের ব্যাপারটা আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি, গাড়ি রেষারেষি, ওভারটেকিং এবং কার আগে কে যাবে—এর কারণে এই ছেলেটির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।’ এ সময় মন্ত্রী তাঁর বক্তব্য ঠিকভাবে প্রকাশের আহ্বান জানান।
মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘ওই সময় তাৎক্ষণিকভাবে আমার হৃদয়ের নাম মনে আসেনি। আমি আসলে হৃদয়ের ঘটনাটি বলেছি। সে ভুল করেছে, তাও বলিনি। তারও ভুল হতে পারে, আমি কিন্তু তার ভুল হয়েছে—এ কথাটি অ্যাব্রাপ্টলি কমেন্ট করিনি।’

