দেশ থেকে বিলুপ্তির পথে “বাবুই পাখি”

জিয়াউদ্দিন লিটন: ছোট বেলায় অনেক কবিতা শিখেছিলাম, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার অনেকগুলোই মন থেকে হারিয়ে গেছে। যে কটা থেকে গেছে, আজ তার একটি। রজনীকান্ত সেনের স্বাধীনতার সুখ। কবিতাটি মনে আছে কেন ভাবি ?– হয়তো ছোট, তাই, কিংবা চিরকাল দূর থেকে অট্টালিকা দেখে বড় হয়েছি বলে।

“স্বাধীনতার সুখ”

———————-রজনীকান্ত সেন

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
“কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”

বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তাই ?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”

বাবুই পাখি প্রায় বিলুপ্তির পথে। কালের বিবর্তনে পৃথিবী থেকে অনেক প্রাণি বিলুপ্তি হতে চলেছে।
এরসাথে দেশের অতি পরিচিত বাবুই পাখিও অনেকটা বিলুপ্তি পথে। আজকাল বাবুই পাখির আর
তেমন দেখা মিলছে না। তালগাছ, খেজুরগাছ ও নারিকেলগাছেও আর দেখা যায় না বাবুই পাখির
বাসা। আগে প্রতিটি গ্রামে, বাড়ির সামনে পিছনে, পুকুরপাড়ে রাস্তার ধারে ও মাঠে-ময়দানে
অসংখ্য তালগাছ, খেজুরগাছ ও নারিকেলগাছ ছিলো। সেসব গাছে আগে বাবুই পাখির অসংখ্য
বাসা দেখা যেত।

ওইসব গাছের পাতা মোড়ানো নিপুণ কারুকার্য খচিত বাবুই পাখির বাসা দেখতে খুব সুন্দর
লাগতো। সন্ধ্যায় যখন বাবুই পাখি বাসায় ফিরতো তখন পাখির কোলাহল শোনা যেত। এখন আর
তেমন ওইসব গাছও নেই, বাবুই পাখিও নেই। বর্তমানে কিছু তালগাছ, খেজুরগাছ ও
নারিকেলগাছ থাকলেও বাবুই পাখি ও তাদের বাসা আর দেখা যায় না। এভাবেই দিনের পর দিন
বিলুপ্তি হতে যাচ্ছে বাবুই পাখি।

সত্যি কথা বলতে অতিসুলভ দর্শন পাখি এরা। এদের সঙ্গে জড়িত রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের
ব্যাপার-স্যাপারও। অনেক গান, কবিতাও রচিত হয়েছে এ পাখি নিয়ে। গ্রামেগঞ্জে কিংবা মফস্বল
এলাকায় ব্যাপকভাবে নজরে পড়ে না আর এখন।এ সম্প্রদায়ের পাখি দলবদ্ধভাবে বাস করে।
সারাদিন চেঁচামেচি করে কাটায়। সামান্যতেই রেগে যায়। নিজেদের মধ্যে কোলাহল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। পাখিটা অতি সহজে কারো দৃষ্টিতে না পড়লেও ওদের বাসাটা ঠিকই সবার নজর কাড়ে। তাল, নারকেল কিংবা খেজুর গাছে সারিবদ্ধভাবে ঝুলতে দেখা যায়। সেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! এ  পাখির বাসা বানানোর কৌশল রীতিমতো বিস্ময়কর বটে।

সুনিপুণ কারিগর বলা যায় এদের। প্রজনন সময় ঘনিয়ে এলে পুরুষ পাখি খেজুর, নলখাগড়া, নারিকেল অথবা তালপাতার পাশ থেকে চিকন লম্বা অংশ ঠোঁট দিয়ে কেটে নেয়। অতঃপর সেটি বয়ে নিয়ে পূর্বনির্ধারিত গাছের পাতার সঙ্গে  সেলাই করে জুড়ে দেয়। এভাবেই বাসা তৈরির সূত্রপাত ঘটায়। তারপর ওই বিন্দুকে কেন্দ্র করে  তৈরি করে বলয়।

বলয়ের চারপাশটা চিকন পাতা দিয়ে সেলাই করে চোঙ্গাকৃতির বাসা বানায়।  নিজস্ব শৈল্পিকগুণে তৈরি করে দৃষ্টিনন্দন বাসা। বাসার ওপর-নিচ থাকে খানিকটা সরু আর  মধ্যখানটা থাকে মোটাসোটা। বাসার মুখ থাকে নিচের দিকে। বাসা তৈরি হলে স্ত্রী পাখি ডিম পেড়ে  তা দিলেও পুরুষ পাখি থাকে অন্য ধান্ধায়। বিজ্ঞানীদের মতে পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে।এ পাখির  বাসা এতই মনোমুগ্ধকর যে, মানুষ তাদের ড্রইংরুমে ঝুলিয়ে রাখতে গর্ববোধ করেন। ঝুলিয়ে রাখে নামিদামি আবাসিক হোটেল গুলোতেও। বলা যায় অনেকটা শোপিসে পরিণত হয়েছে এদের বাসা।

প্রিয়পাঠক, এ পাখির বাংলা নাম: ” বাবুই” , ইংরেজি নাম “বায়া উইভার” (ইধুধ বিধাবৎ), বৈজ্ঞানিক নাম: “প্লসিয়াস ফিলিপপিনাস” গোত্রের নাম “পাসেরিদি” অঞ্চল ভেদে “বাউই” নামেও পরিচিত।

বাবুই পাখি লম্বায় ১৩-১৪ সেন্টিমিটার। প্রজনন সময় পেরিয়ে গেলে স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম  হয়। প্রজনন সময় ঘনিয়ে এলে দেহের রং বদলায়। তখন পুরুষ পাখির মাথা হলুদ আকৃতি ধারণ করে। ঘাড়ের ওপর বন্ধনী তৈরি হয়ে বুকে গিয়ে ছড়িয়ে যায়। কপাল, কান, থুতনি ও গলার বর্ণ  হয় কালচে-বাদামি। অপরদিকে ওই সময় স্ত্রী পাখির ওপরের দিক হলুদাভ-বাদামি রং ধারণ করে।  তার ওপর থাকে বেশ কিছু গাঢ় বাদামি রেখা। ভ্রু, ঘাড়ের পাশ এবং বুক হলুদাভ-বাদামি। নিচের  দিকে হলুদের আভাযুক্ত। তবে কোনো রেখা বা ডোরা থাকে না।

বাবুই পাখির প্রধান খাদ্য শস্যবীজ। ধান, কাউন প্রিয়। প্রজনন সময় ফেব্র“য়ারি থেকে জুলাই। বাসা  বাঁধে তাল, খেজুর, নারিকেল গাছের পাতার সঙ্গে সেলাই করে। ডিম পাড়ে ২-৫টি। ডিম ফুটতে  সময় লাগে ১৩-১৫ দিন। এলাকার বয়স্করা বলেন- এলাকায় আগে তালগাছ, খেজুরগাছ ও নারিকেল গাছে বাবুই পাখি বাস  করতো।

এখন আর বাবুই পাখির দেখাই মিলে না। বাবুই পাখি প্রায় বিলুপ্তি হওয়ার পথে বললে ভূল  হবে না। তালগাছ ও খেজুরগাছ ব্যাপকহারে কেটে ফেলার কারণে ও পাখি শিকারীদের অবৈধ শিকারের কারণে এ পাখি প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাই প্রকৃতির ও প্রাণি সংরক্ষণের জন্য সরকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

—–লেখক~ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।