রফিকুজ্জামান, রংপুর থেকে ঘুরে এসে: গত ১০ নভেম্বর’২০২০ রোজ বুধবার বিকালে রংপুরে বেড়ানোর জন্য ফরিদপুর ত্যাগ করলাম। সাথে ছিলেন, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)’র রাজশাহী বিভাগের সাবেক ডেপুটি ডিরেক্টর ও বিশিষ্ট লেখক উত্তম কুমার বড়ুয়া। ১১ নভেম্বর’২০২০ বৃহস্পতিবার ভোর ৬ টায় রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় গেটে পৌঁছে গেলাম। সেখানে আগে থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি রংপুর জোনে কর্মরত একজন সাব ইন্সপেক্টর জনাব আহসান সুমন সাহেব মোটর বাইক নিয়ে অপেক্ষমান ছিলেন। আহসান সাহেবের বড় ভাই রকিব উদ্দিন আহাম্মাদ রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের একজন সিনিয়র ইমাম কাম খতিব। সিআইডি’র আহসান সুমন আমার প্রিয় মানুষদের একজন। যাঁর নম্র ও ভদ্র আচরণে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। তিনি সিআইডি’র একজন সৎ ও সাহসী অফিসার।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যেই তাঁদের বাসায় বড়ুয়া বাবু ও আমি দুপুরের খাবার খেয়ে রংপুর শহরের কিছু দর্শণীয় স্থানে ঘুরতে গেলাস। ঐদিন বিকেলেই ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে ফের রওনা দিলাম। গাড়ীতে বসে বড়ুয়া বাবু’র সাথে “বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়” ও বেগম রোকেয়া বিষয়ে কথা হচ্ছিল। বড়ুয়া স্যার জানালেন, কয়েক কিলোমিটার সামনেই “বেগম রোকেয়া’র বসত ভিটা। স্যারকে সেখানে নিয়ে যেতে অনুরোধ করলাম। অতপর সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগেই বেগম রোকেয়ার পৈত্রিক বসত ভিটায় পৌঁছে গেলাম। কিন্তু তার বসত ভিটার বাস্তব চিত্র দেখে হতাশ হলাম। জরাজীর্ণ পরিবেশ, অযত্ন আর অবহেলায় তাঁর শেষ স্মৃতি চিহ্ন টুকুও হারিয়ে যেতে বসেছে।
হাঁ, আমি সেই বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন অর্থ্যাৎ “বেগম রোকেয়া”র কথাই বলছি। যিনি ছিলেন একাধারে একজন বাঙালি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। যিনি বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রথম বাঙালি নারীবাদী লেখক। যাঁকে ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ জরিপে ষষ্ঠ নির্বাচিত ঘোষনা করেছিলো।
বেগম রোকেয়ার পৈত্রিক বসত ভিটার বাস্তব চিত্র দেখে ভেবেছিলাম, এটাই কি সেই নারীবাদী লেখিকা “বেগম রোকেয়া”র পৈত্রিক বসত ভিটা? ছোট ছোট সাইনবোর্ডে বেগম রোকেয়ার বসত ভিটার কথা লেখা দেখতে পেয়ে শেষ অবধি নিজেকে বিশ্বাস করিয়ে ছিলাম যে, এটাই বেগম রোকেয়ার পৈত্রিক বসত ভিটা। যেটা সংস্কার বা সঠিক সংরক্ষণ করা হয়নি। কেন করা হয়নি? তাঁর উত্তর মেলেনি।
তাঁর স্মৃতি বিজড়িত পৈত্রিক বসত ভিটার করুন ভগ্নদশা দেখে ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে, যিনি মতিচূর (১৯০৪) প্রবন্ধ গ্রন্থে নারী-পুরুষের সমকক্ষতার যুক্তি দিয়ে এদেশের অবহেলিত নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনসহ সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় সকল নারীকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন, এটা কি তাঁরই পৈত্রিক বসত ভিটা? যিনি নারীদের “শিক্ষার অভাব”কে নারী পশ্চাৎপদতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করে নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন, এটা কি তাঁরই পৈত্রিক ভিটা? পরে স্থানীয় কয়েকজন মুরুব্বীর সাথে আলাপ করে জানলাম, আসলেই এটাই হচ্ছে বেগম রোকেয়ার পৈত্রিক বসত ভিটা।
এটা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত যে, বেগম রোকেয়া সমাজ সংস্কারক ও নারী জাগরণের অগ্রদূত ছিলেন। জেনেছি, রোকেয়ার বাবা জহীরুদ্দিন মুহাম্মদ আবু আলী হায়দার ছিলেন তাঁর বংশের শেষ জমিদার। রংপুরের পায়রাবন্দে এই জমিদার বংশেই ১৮৮০ সালে বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহন করেন। তিনি ১৯৩২ সালে কলকাতায় মারা যান। বেগম রোকেয়ার কর্ম ও আদর্শ উদযাপনের লক্ষ্যে রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু একই দিন ৯ ডিসেম্বর হওয়ায় দিবসটি আমাদের বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বেগম রোকেয়া দিবস’ হিসেবে পালন হয়ে আসছে। এমনকি এদিনেই বিশিষ্ট নারীদের অনন্য অর্জনের জন্য “বেগম রোকেয়া পদক”ও প্রদান করে আসছে। লেখালেখির পাশাপাশী তিনি ১৯০৯ সালে এদেশে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯১৬ সালে আনজুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম নামে একটি নারী সংগঠনও তিনি গড়ে তোলেন। বাংলা ও ইংরেজিতে তাঁর লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে নারী জাগরণ, নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়গুলো সাহসের সাথে তুলে ধরেছেন। তাঁর এসকল অনন্য অবদান অস্বীকারযোগ্য নয়।
অথচ তাঁর পৈত্রিক ভিটায় এসে একি দেখলাম? এমন একজন খ্যাতনামা নারীবাদী লেখিকার পৈতৃক ভিটা ও বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি অবহেলায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে?
এখানের স্থানীয় কিছু মুরব্বীরা বেদনার সাথে জানালেন, বেগম রোকেয়ার কিছু স্বজনেরা তাদের নিজ উদ্যোগে রোকেয়ার শেষ স্মৃতিটুকু বাঁচিয়ে রেখেছেন। রাস্ট্রীয়ভাবে তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহন এখন আর চোখে পড়ছে না।
স্থানীয়দের কথাগুলি শুনে ঐদিন খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম। পরিশেষে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’র সুদৃষ্টি কামনা করে বলতে চাই, এখনই বেগম রোকেয়া’র পৈত্রিক বসত ভিটা সংস্কারপূর্বক সংরক্ষনের সুব্যবস্থা করুন। নতুবা এটা জাতীর জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক হয়ে উঠবে।।
—— রফিকুজ্জামান
সম্পাদক
ফরিদপুর মেইল।
১৫/১১/২০২০ ইং
রাত ২ টা।

